Education

মিহিরকুল: উত্তরের তুষারঝড় থেকে উঠে আসা এক নির্মম রাজা

মিহিরকুল: উত্তরের তুষারঝড় থেকে উঠে আসা এক নির্মম রাজা মিহিরকুল: উত্তরের তুষারঝড় থেকে উঠে আসা এক নির্মম রাজা মিহিরকুল: উত্তরের তুষারঝড় থেকে উঠে আসা এক নির্মম রাজা

উত্তর দিকের বরফঢাকা সমতল পেরিয়ে একদল অশ্বারোহী ভারতীয় সীমান্তে ঢোকে। তাদের চোখে আগুনের ঝিলিক, হাতে বাঁকানো ধনুক আর সেই দলের সামনের সারিতে এক তরুণ রাজপুত্র। নাম মিহিরকুল

এখনও তার বয়স কম, কিন্তু তার চোখে ছিল এমন এক কঠিন দৃষ্টি, যা দেখেই বোঝা যায় এই মানুষটি জন্ম থেকে ঝড়ের সন্তান। মিহিরকুল ছিল হুণ রাজা তোরামান এর ছেলে। ছোটবেলা থেকেই সে দেখেছে যুদ্ধ, রক্ত, অশ্বারোহণ আর দখলদারির শিক্ষা। প্রেম, করুণা এসব তার জীবনে জায়গা পায়নি। তার বিশ্ব ছিল শক্তি আর ভয়।

৪৯০–৫০০ খ্রিস্টাব্দ
মিহিরকুল জন্মগ্রহণ (সঠিক সাল অজানা, অধিকাংশ ঐতিহাসিকের অনুমান) শৈশব কাটে হুণদের যাযাবর জীবন ও যুদ্ধ–শিবিরে। অল্প বয়স থেকে যুদ্ধকৌশল, অশ্বারোহণ ও ধনুর্বিদ্যায় প্রশিক্ষিত।

শৈশব: অন্ধকারের মধ্যে বড় হওয়া

মিহিরকুলের শৈশব কেটেছে তীক্ষ্ণ ঠান্ডা আর যাযাবর জীবনের মধ্যে। শিশু অবস্থাতেই তাকে ধনুক ধরানো হয়, ঘোড়া ছুটানো শেখানো হয়। রাতের আগুন জ্বলে উঠলে বৃদ্ধ যোদ্ধারা বলত—"তুমি তো তোর­মানের ছেলে নও… তুমি জন্মেছ আকাশের তুষারঝড় থেকে।" এই কথায় তার মনে জন্ম নেয় প্রচণ্ড অহংকার। সে বিশ্বাস করতে শুরু করে " আমি শুধু রাজা হবো না, আমি হবো পৃথিবীর শাসক।"

প্রায় ৫০০–৫০৫ খ্রিস্টাব্দ

হুণ রাজা তোরা­মান উত্তর ভারতে শক্তিশালী দখল প্রতিষ্ঠা করেন। মিহিরকুল রাজপুত্র হিসেবে সামরিক অভিযান পরিচালনায় যোগ দেয়।

সিংহাসনে বসা: সময়ের নিষ্ঠুর সন্তান

তোরমানের মৃত্যুর পর হুণ রাজ্য অস্থির হয়ে ওঠে। ক্ষমতার টানাপোড়েনে অনেকে লড়াই করে, কিন্তু শেষে মিহিরকুল জয়ী হয়। খুব অল্প বয়সেই সে হয়ে যায় হুণ সাম্রাজ্যের সম্রাট। তার রাজধানী ছিল কাশ্মীর অঞ্চলের শ্রীনগর। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নির্মিত সেই নগরে মিহিরকুলের সিংহাসন ছিল উচ্চ আর ভয়প্রদ। রাজসভায় সবাই নীরব হয়ে দাঁড়াত, কারণ এই যুবক রাজার রোষ ছিল অগ্নির মতো।

৫০৫–৫১৫ খ্রিস্টাব্দ
তোরা­মান অসুস্থ বা নিহত হন (সময়টি আনুমানিক)। রাজ্য উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘর্ষ শুরু হয়। মিহিরকুল শেষ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দীদের পরাজিত করে হুণ সাম্রাজ্যের সম্রাট হয়। রাজধানী স্থাপন করে কাশ্মীরের শ্রিনগরে।

আক্রমণের দিনগুলো: উত্তর থেকে নেমে আসা কালো মেঘ

মিহিরকুল ভারতীয় উপমহাদেশে আগুনের ঝড় নিয়ে আসে। উত্তরের সীমান্তে তার সৈন্যদের আগমন মানেই ছিল— ধুলো উড়ে যাওয়া গ্রাম,ধ্বংস হওয়া মন্দির,ওবৌদ্ধ বিহার, মানুষের আর্তচিৎকার। চীনা ভিক্ষু হিউয়েন সাং পরে লিখেছিলেন—"আমি অনেক রাজাকে দেখেছি, কিন্তু মিহিরকুলের মতো নিষ্ঠুর কাউকে দেখিনি।" মিহিরকুল বৌদ্ধ ভিক্ষুদের বিশেষভাবে অপছন্দ করত। অনেক বিহার সে পুড়িয়ে দেয়। তার শাসন ছিল কড়া, নির্মম, ভয়ানক।

প্রায় ৫১৫–৫২৩ খ্রিস্টাব্দ
মিহিরকুলের অত্যাচারী শাসন শুরু। পাঞ্জাব, গন্ধারা, সিয়ালকোট, কাবুল–অঞ্চলে শক্তি বৃদ্ধি। বহু বৌদ্ধ বিহার ও মঠ ধ্বংস—ইতিহাসে তার নিষ্ঠুরতার প্রথম উল্লেখ।চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং পরবর্তীতে এ সময়কে “ভীতিকর যুগ” বলে উল্লেখ করেন।

শক্তির শিখর: এক এমন মুহূর্ত, যখন ভারত কাঁপছিল

এক সময় উত্তর ভারতের বিশাল অংশ মিহিরকুলের পতাকার নিচে চলে আসে। কাশ্মীর, গন্ধারা, পাঞ্জাব—তার সেনারা দ্রুত সব দখল করে। মিহিরকুল নিজের দাপটে বলত "যেখানে আমার অশ্বের খুর পড়ে, সেখানে সূর্যের আলোও ভয় পায়।"সে নিজেকে দেবতার মতো ভাবতে শুরু করে। শিবের প্রতি তার গভীর বিশ্বাস জন্মায় সে ভাবত, শিব তাকে অজেয় শক্তি দিয়েছেন।

৫২০–৫২৭ খ্রিস্টাব্দ
মিহিরকুল উত্তর ভারতের বড় অংশ দখলে আনে। বিন্দুসারের মৃত্যুর পর (৫২৮-এর কাছাকাছি) ভারতের ক্ষমতার কাঠামো দুর্বল থাকায় হুনদের আগ্রাসন বাড়ে।
মিহিরকুল নিজেকে “শিবের আশীর্বাদপ্রাপ্ত সম্রাট” বলে দাবি করতে শুরু করে।

বদলের শুরু: এক বীরের উত্থান

কিন্তু পৃথিবীতে কোনো রাজত্ব চিরস্থায়ী হয় না। মালবের রাজা যশোধর্মন উঠে দাঁড়ান। তিনি ছিলেন ধীর, বুদ্ধিমান ও ন্যায়পরায়ণ। মিহিরকুলের অত্যাচারে ক্লান্ত জনতার আশীর্বাদ যেন যশোধর্মনের হাতে শক্তি হয়ে ফিরে আসে। মালবের প্রান্তরে দুই পক্ষের যুদ্ধ হয়। মিহিরকুলের ভয়ঙ্কর অশ্বারোহীরা সামনে এগোয়, কিন্তু যশোধর্মনের সেনারা তাদের দেয়ালে পরিণত হয়। অবশেষে সেই অদম্য রাজাকে চমকে দিয়ে মিহিরকুল পরাজিত হয়। এটাই ছিল সে সময়ের ভারতের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়।

৫২৮ খ্রিস্টাব্দ — টার্নিং পয়েন্ট
মালবের রাজা যশোধর্মন হুণদের বিরুদ্ধে জোট গঠন করেন। মালবের যুদ্ধে যশোধর্মন মিহিরকুলকে ভয়ঙ্করভাবে পরাজিত করেন। এটিই মিহিরকুল এবং ভারতীয় হুণদের শক্তির পতনের শুরু। মান্দসৌর শিলালিপিতে যশোধর্মনের এই বিজয়ের উল্লেখ পাওয়া যায়।

অন্তিম জীবন: অন্ধকারের রাজাকে গ্রাস করল নীরবতা

পরাজয়ের পর মিহিরকুল পূর্বের মতো সাম্রাজ্য ধরে রাখতে পারে না। সে একসময় দক্ষিণ ভারতের দিকে সরে যায়, তারপর আবার উত্তর দিকে ফিরে আসে। শেষ বয়সে তার স্বাস্থ্য ভাঙতে থাকে। বলা হয় মিহিরকুল মৃত্যুর আগের সন্ধ্যায় বলেছিল:" আমি পৃথিবী জয় করতে চেয়েছিলাম,কিন্তু শেষে বুঝলাম…ভয় দিয়ে মানুষকে বেঁধে রাখা যায়, কিন্তু ভালোবাসা ছাড়া কোনো রাজ্য টেকে না।" তার মৃত্যু হয় নিঃসঙ্গ অবস্থায়। তার সাম্রাজ্যও ধীরে ধীরে বিলীন হয়।শুধু ইতিহাসের পাতায় রয়ে যায় তার নাম। এক নির্মম কিন্তু কিংবদন্তি রাজা, যার উত্থান ছিল ঝড়ের মতো এবং পতন ছিল নীরবতার মতো।

৫২৮–৫৩২ খ্রিস্টাব্দ
পরাজয়ের পর মিহিরকুল দক্ষিণ ভারতে আশ্রয় নিতে চায়, কিন্তু স্থানীয় রাজারা তাকে প্রত্যাখ্যান করেন। পরে সে কাশ্মীরে ফিরে আসে এবং সীমিত অঞ্চল নিয়ে শাসন চালায়। হুণদের সাম্রাজ্য ভেঙে ছোট ছোট গোষ্ঠীতে পরিণত হয়।

প্রায় ৫৩২–৫৪০ খ্রিস্টাব্দ
মিহিরকুলের শাসন ক্ষমতা দ্রুত কমে যায়। বয়স, যুদ্ধের আঘাত ও পরাজয়ের ধাক্কায় শারীরিক দুর্বলতা বাড়ে। কিছু ইতিহাসে বলা হয়েছে—মিহিরকুল শেষ বয়সে অনুশোচনা প্রকাশ করেছিল। প্রায় ৫৪০ খ্রিস্টাব্দে মিহিরকুলের মৃত্যু হয়। তার সঙ্গে ভারতীয় হুণদের সাম্রাজ্যও প্রায় শেষ হয়ে যায়। পরবর্তীতে হুণরা ছোট ছোট উপজাতিতে ভেঙে মধ্য এশিয়ায় মিশে যায়।

সংক্ষিপ্ত Timeline টেবিল

সাল    ঘটনা

৪৯০–৫০০    মিহিরকুলের জন্ম ও শৈশব
৫০৫–৫১৫    তোরা­মানের মৃত্যু; মিহিরকুলের ক্ষমতায় আসা
৫১৫–৫২৩    বৌদ্ধ বিহার ধ্বংস, উত্তর ভারতে দখল
৫২০–৫২৭    মিহিরকুলের সর্বোচ্চ সামরিক শক্তি
৫২৮    যশোধর্মনের কাছে বড় পরাজয়
৫২৮–৫৩২    দক্ষিণে পালিয়ে যাওয়া ও প্রত্যাখ্যান
৫৩২–৫৪০    কাশ্মীরে দুর্বল শাসন
৫৪০    মিহিরকুলের মৃত্যু

 

What's your reaction?

0
AWESOME!
AWESOME!
0
LOVED
LOVED
0
NICE
NICE
0
LOL
LOL
0
FUNNY
FUNNY
0
EW!
EW!
0
OMG!
OMG!
0
FAIL!
FAIL!

Comments

Leave a Reply